বিকেল চারটে। টালিগঞ্জ থেকে বৈষ্ণবঘাটা হাওড়া মিনি। সাধারণত জায়গা পাওয়া যায়না। আজ বাসের বাইরে থেকে দেখলাম একই অবস্থা, ভিতরে অনেক লোক দাঁড়িয়ে আছে। তাও উঠেই পড়লাম। উঠেই বাসের বাঁদিকে সেকেন্ড সিটটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। সংগে সংগে সেই সিটে বসা এক বয়স্ক ভদ্রলোক ব্যস্ত হয়ে চনমন করে ওপর দিকটায় কি যেন খোঁজার চেষ্টা করলেন। মনে হলো উনি লেডিস লেখাটা খুঁজছেন। অন্যান্য বাসে ঐখানটায় লেডিস লেখাটা থাকে। কিন্তু এটা তো মিনি। আলাদা করে লেডিস কথাটা থাকার কথা নয়। তাও তারপরেই উনি আমায় ইশারা করে বসতে বললেন। আমি ভাবলাম - কি মজা, এই তো জায়গা পেলাম। এবার মোবাইলটা নিয়ে একটু ফেসবুক, একটু হোয়াটস অ্যাপ, আর অনেক ক্যান্ডি ক্রাশ!
সাধারণত কেউ নেমে যাওয়ার আগে জায়গা ছেড়ে দেয়। আমিও ভেবেছিলাম উনি বুঝি নেমে যাবেন। কিন্তু উনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি একবার জিজ্ঞেস করলাম আপনি নামবেন তো? উনি আমাকে ইশারায় আশ্বস্ত করলেন যে আমার উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। আমি মোবাইল হাতে নিয়ে নিশ্চিন্তে আপডেট দেখতে লাগলাম। মিনিট পাঁচেক পরে দেখি একটু সামনে ডানদিকে একটা সিট খালি হতেই একজন ওনাকে ডেকে বসতে অনুরোধ করছে। তখন আমার খুব অস্বস্তি হতে লাগলো। উনি আমায় সিটটা দিয়ে নিজে দাঁড়িয়ে আছেন, নামছেন না - অস্বস্তি লাগারই কথা। উনি তাকেও ইশারায় আশ্বস্ত করলেন উদ্বিগ্ন না হতে। উনি কেমন একটু বলি, তাহলেই অস্বস্তির কারণটাও বোঝা যাবে।
বয়স পঁচাত্তর বা আরো একটু বেশি। বয়সের ভারে কাঁধটা সামান্য ঝুঁকেও গেছে। চুল কাঁচাপাকা মিশিয়ে। দেখতে খুব সুন্দর। চেহারায় পুরোদস্তুর আভিজাত্যের ছাপ। অফ হোয়াইট শার্ট প্যান্টে ইন করে পরা। ইয়ং বয়সে উনি যে অনেকের মনেই স্থান পেয়েছেন তাই নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কথা কমই বললেন, প্রায় না বলার মতোই। শুধু যতটুকু বললে বোঝা যায় উনি বোবা নন ঠিক ততটুকুই। তবে দাঁড়াতে তাঁর অসুবিধে হচ্ছিল এটুকু বোঝা যাচ্ছিল। হাতে একটা প্লাস্টিক প্যাকেটও ছিলো।
সাধারণত বয়স্ক মানুষকে সবাই জায়গা ছেড়ে দেয়। আজ উনিই আমায় দিলেন। উনি দাঁড়িয়ে থাকায় আমার অস্বস্তি হচ্ছে বুঝতে পেরেই মনে হয় তিনি সামনের লোকটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। আর মাঝে মাঝেই একটু ঝুঁকে বাসের সামনের কাচ দিয়ে দেখার চেষ্টা করছেন তাঁর নামার জায়গাটা এসেছে কিনা। আমি যতই দেখছিলাম আমার অস্বস্তি ততই বেড়ে যাচ্ছিলো। নিজের মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করছিলো। গোটা বাস হয়তো ভাবছিলো মেয়েটা কি রে বাবা? বয়স্ক মানুষটা জায়গা দিলো আর ও চুপচাপ বসে গেলো!! নিজেকে কেমন যেন মনে হচ্ছিলো। উনি সেটাও মনে হয় আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। কারণ পরক্ষণেই তিনি ফুটবোর্ডে চলে গেলেন। ভাবলাম - যাক শান্তি তিনি এবার নামবেন। নামলেন না। আমার অস্বস্তি কমাতে তিনি ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। নামলেন আরোও পরে। ঢাকা কালীবাড়ি স্টপেজে।
সেই দূরত্বটা টালিগঞ্জ থেকে হয়তো এমন কিছু বেশি না। বাস ঠিকঠাক এলে পাঁচ-সাত মিনিটেই পৌঁছে যায়। কিন্তু বিকেল চারটের জ্যাম, সিগন্যাল আর বাসের ঢিকঢিক গতিতে নিজস্ব চালে চলায় সময় অনেকটাই লেগেছিলো। কিন্তু তিনি এতো বয়স্ক মানুষ হয়ে কেনো এটা করলেন আমি বুঝে উঠতে পারলাম না। হয় খুব ভালো মনের মানুষ, নয় তিনি ভয় পাচ্ছিলেন এই বুঝি তাঁর নামার জায়গাটা মিস হয়ে যাবে। ভালো মনের মানুষ এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। স্টপেজের কথা তো জায়গা না ছেড়েই কাউকে বা কন্ডাক্টরকে জিজ্ঞেস করলেই জানা যেত। তিনি সেটা না করে নিজে কষ্ট করে দাঁড়িয়ে এলেন। ওনাকে দেখে তখন আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম! উনি কেনো এটা করছিলেন? আমি আমার স্বভাবগত কারণেই জিজ্ঞেস করতে পারলামনা। শুধু তাকিয়ে থেকে অবাক হলাম আর অস্বস্তিতে ভুগলাম।
মনে পড়ল, দুদিন আগেই ওনার থেকে অনেক কম বয়সী মানে পঞ্চাশ পঞ্চান্ন হবে এমন এক লোককে দেখছিলাম, যিনি বাসে উঠেই একজনকে খুব উগ্র মেজাজ দিয়ে বলছিলেন - এখানে সিনিয়র সিটিজেন লেখা আছে দেখতে পাচ্ছেন না? তাও বসে আছেন? উঠুন!